কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, আড়ালে পৃষ্ঠপোষকেরা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তারের পরও
থামছে না কিশোর গ্যাংয়ের
তৎপরতা। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা-বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখলবাজি
ও সহিংসতার ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের
জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। অপরাধে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার
হচ্ছে কিশোর ও তরুণরা। তবে
তাদের পেছনে থাকা কথিত পৃষ্ঠপোষক,
অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাদের শনাক্ত
করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি অপরাধ
দমনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশে সক্রিয়
কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৮৬টি। এর মধ্যে রাজধানী
ঢাকায় রয়েছে ১৫৯টি। গত বছর রাজধানীতে
সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। এক
বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়েছে
৪১টি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর
আটটি বিভাগে এসব গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা
তিন হাজারের বেশি।পুলিশ সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কিশোর
গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের নাম উঠে এসেছে।
তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের
সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের
ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে
দায় নির্ধারণ জরুরি।পুলিশের তালিকায় চট্টগ্রামে ৯৮টি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুর
মহানগরে ১৩টি গ্যাং সক্রিয়
থাকার তথ্য রয়েছে। তালিকাভুক্ত
গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রায় ৮০ শতাংশের বয়স
১৬ থেকে ২৫ বছরের
মধ্যে। ফলে কিশোর গ্যাং
নামে পরিচিত এসব দলের সঙ্গে
প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদেরও সম্পৃক্ততা রয়েছে।কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন শুধু পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন এলাকায়
মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জমি ও বাড়ি
দখল এবং প্রতিপক্ষকে ভয়
দেখানোর মতো অপরাধে তাদের
ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাতেও
এসব দলের সদস্যদের সম্পৃক্ততার
কথা উঠে এসেছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে গ্যাং সদস্যদের
মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও দেখা
যাচ্ছে। চাপাতি, ছুরি ও অন্যান্য
ধারালো অস্ত্র নিয়ে দলবদ্ধভাবে চলাচলের
এসব দৃশ্য জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের
ভিডিও অপরাধী গোষ্ঠীর শক্তি প্রদর্শন এবং প্রতিপক্ষকে ভয়
দেখানোর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায়
স্থানীয় প্রভাব ও আধিপত্যের সমীকরণে
পরিবর্তন এলেও কিশোরদের ব্যবহার
করে অপরাধ পরিচালনার প্রবণতা অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও পুরোনো প্রভাবশালীদের, আবার কোথাও নতুন
করে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের আশ্রয়ে গ্যাং সদস্যদের তৎপর থাকার তথ্য
পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর
দাবি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের
মতে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক
স্বার্থ রক্ষায় কিশোরদের ব্যবহার করা হয়। এভাবে
অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার প্রক্রিয়ায়
কিশোররা ধীরে ধীরে গুরুতর
অপরাধে জড়িয়ে যেতে পারে।তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে মাসল পাওয়ারের একটি
সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা
নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি বা বিভিন্ন অবৈধ
অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ম্যানপাওয়ার লাগে।
সেই ম্যানপাওয়ার অনেক সময় কিশোরদের
দিয়ে তৈরি করা হয়।
এখানেই তৈরি হয় ক্রিমিনাল
পলিটিশিয়ান নেক্সাস।”কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা
করে অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, “কোনো
অপরাধী জন্মগতভাবে অপরাধী হয় না। বরং
সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার
মধ্য দিয়ে তাকে অপরাধে
টেনে নেওয়া হয়। প্রথমে তারা
ছোটখাটো কাজ করে। যেমন—মাদক পৌঁছে দেওয়া,
খবর দেওয়া, এলাকায় মহড়া দেওয়া, চাঁদা
তোলা কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো। পরে
ধীরে ধীরে বড় অপরাধীদের
তত্ত্বাবধানে তারা গুরুতর অপরাধে
জড়িয়ে পড়ে।”কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
তুলে ধরে তিনি বলেন,
“যারা আজ কিশোর গ্যাংয়ের
সদস্য, তাদের একটি অংশই আগামী
দিনে বড় গ্যাং লিডার
বা সংঘবদ্ধ অপরাধী হয়ে ওঠে।”তিনি আরও বলেন, “একজন
কিশোর যখন দেখে কম
ঝুঁকিতে বেশি লাভ, এলাকায়
পরিচিতি, বড়ভাইদের সান্নিধ্য, অস্ত্র, মোটরসাইকেল ও অর্থ পাওয়া
যাচ্ছে, তখন তার কাছে
অপরাধ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।”গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায়
কিশোর অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি
নতুন করে আলোচনায় আসে।
ঘটনাটি ঘিরে কিশোর অপরাধের
বিস্তার, অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায়
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগও
সামনে আসছে। কিছু ঘটনায় সাধারণ
মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, আবার কোথাও আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ
রয়েছে।অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্যাং
সদস্যদের গ্রেপ্তার করে অপরাধের বিস্তার
পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি
নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষক ও
সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রয়োজন।কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে সদস্যদের পাশাপাশি
পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার
নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ
সদর দপ্তর।পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত
আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান
বলেন, “সারা দেশে কিশোর
গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের
বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে
নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন
মহানগর ও জেলায় সামাজিক
ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া
হচ্ছে।”ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, “কিশোর
গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি।
প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি, গ্রেপ্তার করছি। এ ছাড়া এই
অপরাধ নির্মূলে অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক
করা হচ্ছে।”কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পরিবারের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে
তিনি বলেন, “সন্তান সন্ধ্যার পর বাসা থেকে
কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, সে
বিষয়ে বাবা-মাকে সচেতন
হতে হবে। অভিভাবক সচেতন
হলে কিশোর অপরাধ আস্তে আস্তে কমে আসবে।”শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বিধানের কথাও উল্লেখ করেন
এই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর মতে, পরিবার
থেকে সুশিক্ষা, সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনা
নিশ্চিত করা জরুরি।কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী
বাহিনীর অভিযান, পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সচেতন
করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। অপরাধে জড়িত সদস্যদের পাশাপাশি
নেপথ্যের নির্দেশদাতা ও অর্থদাতাদের ভূমিকা
তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেলে এসব
গ্যাংয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
১৫ অক্টোবর ২০২৬